তিলপাপাড়া মাদরাসার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পৃথিবীর মানুষকে হেদায়াতের পথে পরিচালিত করতে, আঁধার থেকে আলোর পথে আনতে আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে ইলমে ওহী দিয়ে শত সহস্র নবী ও রাসূলকে পাঠিয়েছেন। বিশ^নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তিনি ইলমে ওহীর প্রথম প্রচার কেন্দ্র হিসাবে হযরত আরকাম রাযি. এর বাড়িকে নির্বাচন করেন। যা ‘দারুল আরকাম’ নামে প্রসিদ্ধ। ইসলাম প্রচারের প্রথম কেন্দ্র ও প্রথম মাদরাসাও এটি। এখানেই হযরত উমর রাযি. ইসলাম গ্রহণ করেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে সেখানে প্রথমে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যার নাম মসজিদে নববী। ইলমে ওহী তথা দ্বীন প্রচারের দ্বিতীয় কেন্দ্র এটি। তাদের থাকার জন্য নির্মিত হয় মসজিদ সংলগ্ন একটি কুটির, যাকে বলা হয় ‘সুফফা’।
এখানে অবস্থানকারী সাহাবীগণ ইতিহাসে ‘আসহাবে সুফফা’ নামে খ্যাত।
মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, গজনীর সুলতান মাহমুদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ার প্রথম ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- মাদরাসায়ে মাহমুদিয়া এবং নিশাপুরের মাদরাসা হাম্মাদিয়া, বাগদাদের নিজামিয়া, মিশরের জামিয়া আজহার, তিউনিসিয়ার জামিয়া কায়রুয়ান, স্পেনের জামিয়া কর্ডোভা ও ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ ইত্যাদি খ্যাতনামা দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকার খিলগাঁও, তিলপাপাড়া এলাকার কতিপয় ধর্মপ্রাণ মহৎ ব্যক্তি দ্বীন প্রচার প্রসারের লক্ষ্যে প্রথমত একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। অতঃপর তৎসংলগ্ন পশ্চিম দিকে একটি মক্তব ও হিফজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। আলহামদুলিল্লাহ! ধীরে ধীরে এই মক্তব ও হিফজ বিভাগ কিতাব বিভাগের সকল জামাত অতিক্রম করে ২০২১ খ্রিস্টাব্দে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিস (মাষ্টার্স সমমান) চালু করার মধ্য দিয়ে তিলপাপাড়া মাদরাসা তার দীর্ঘ দিনের অভিযাত্রা পূর্ণ করে।
তিলপাপাড়া মাদরাসার ছাত্রগণ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিস্ময়কর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে আসছে এবং বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানের নাম: তিলপাপাড়া মদিনাতুল উলূম ইসলামিয়া মাদরাসা
অবস্থান: ঢাকা-১২১৯, ১৯৪/এ খিলগাঁও, তিলপাপাড়া এর ৮নং গলির (কাপড়ের গলি) তিলপাপাড়া জামে মসজিদের পশ্চিম দিকে অবস্থিত।
প্রতিষ্ঠাকাল: ২০১১ ঈসায়ী
শিক্ষক ও কর্মচারী সংখ্যা: ৪০ জন
ছাত্র সংখ্যা: প্রায় ৪০০ জন
আয়তন: প্রায় ৪ কাঠা জায়গার উপর
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
- সাহাবায়ে কেরাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, আকাবিরে দ্বীন ও সালফে-সালেহীনের গবেষণাপ্রসূত জ্ঞানের আলোকে শিক্ষার্থীদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাদান।
- ইলমে দ্বীন হাসিল এর সাথে সাথে নেক আমল ও আখলাকে নববীর আলোকে এমন একদল আলেমে দ্বীন তৈরি করা, যারা সাহাবায়ে কেরাম ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীন এর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ওরাসাতে নববীর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন।
- শিরক বেদআত সহ সর্বপ্রকার বাতিল ফিরকার মুকাবিলা ও মূলোৎপাটন করতঃ ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা-বিশ্বাস জনগণের মাঝে প্রচার করা।
- জীবনের সর্বক্ষেত্রে শাআ’য়েরে দিন প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।
- আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে তাজকিয়ায়ে নফসের প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
- ইয়াতিম ও অসহায় শিশু-কিশোরদেরকে আশ্রয়দান করতঃ উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষাদান করা।
- শিক্ষার্থীকে ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মুবাল্লিগ ও দ্বীনের একান্ত খাদেম রূপে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ দান করা।
- দাওয়াত ও তাবলীগে দ্বীনের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
মাদরাসার বিভাগসমূহ
- মক্তব বিভাগ: এ বিভাগে কুরআনের প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সাথে জীবনঘনিষ্ট ইসলামের মৌলিক মাসায়েলসহ কুরআনুল কারীমের তালীম দেওয়া হয়। এই বিভাগ থেকেই মূলত ছাত্রদের পড়ালেখার হাতেখড়ি।
- নাজেরা বিভাগ: দ্বিতীয় ধাপে নাজেরা বিভাগে পূর্ণ কুরআন শরীফ সহীহ শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত শিক্ষাদান করা হয়। নাজেরা থেকে একজন ছাত্র মেধা বিবেচনায় যে কোন বিভাগে ভর্তি হতে পারে।
- হিফজুল কুরআন বিভাগ: এ বিভাগটি মাদরাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যথানিয়মে চালু রয়েছে। এতে পূর্ণ কুরআন হিফজ (মুখস্থ) করানো হয়।
- কিতাব বিভাগ: এতে তাইসীর থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত প্রতি ক্লাসে দক্ষ, আন্তরিক ও মুখলিস মুদাররিসগণ দরস প্রদান করেন। প্রতি জামাতের বিশেষ জিম্মাদার রয়েছেন যারা ছাত্রদের ২৪ ঘন্টা সময়কে হেফাজতের ফিকির করেন।
মাদরাসার কার্যক্রম
- গ্রন্থাগার: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই তিলপাপাড়া মাদরাসায় একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার রয়েছে। বর্তমানে হাদীস, তাফসির, ফিকহ, কালাম, সিরাত, তারিখ, আখলাক, আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র, মানতেক, হেকমতসহ বিভিন্ন ভাষার লক্ষাধিক টাকার কিতাবাদি ও বই-পুস্তক জামিয়ার গ্রন্থাগারে সংগৃহীত আছে।
- ছাত্র পাঠাগার: সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত পঠিত বিষয়ের জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম, সাহাবায়ে কেরাম, আইম্মায়ে দ্বীন ও বুযুর্গানে উম্মতের জীবনচরিত, মালফুজাত, মাকতুবাত ও তাদের গ্রন্থাবলী পাঠের মাধ্যমে স্বীয় নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ও সাধারণ জ্ঞানের বই পুস্তক পাঠের মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি প্রশস্ত ও আধুনিক যুগ জিজ্ঞাসায় বিভিন্ন বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্রদের জন্য স্বতন্ত্র একটি ছাত্র পাঠাগারের ব্যবস্থা রয়েছে।
- দেয়াল পত্রিকা: লেখনীর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষা জনগণের সামনে তুলে ধরার মহৎ সংকল্প নিয়ে তিলপাপাড়া মাদরাসার শিক্ষার্থীগণ ‘আল-মদীনা’ নামে বাংলা ভাষায় একটি দেয়ালিকা প্রকাশ করে থাকে।
- বক্তৃতা প্রশিক্ষণ সভা: দ্বীনের আলো জনগণের মাঝে সুন্দরভাবে প্রচারে বাকশক্তির দক্ষতা এক মোক্ষম মাধ্যম। এই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রতি এক সপ্তাহ অন্তর অন্তর বৃহস্পতিবার গ্রুপ ভিত্তিক বক্তৃতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
- আবাসিক ছাত্রাবাস: বাইরের বদদ্বীনি পরিবেশ শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের অনুকূল নয়। তাই আসাতিযায়ে কিরামের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ছাত্রদেরকে আদর্শ ও চরিত্রবান রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অত্র জামিয়ায় আবাসিক ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- বোর্ডিং: নির্দিষ্ট পরিমাণ খোরাকির বিনিময়ে আবাসিক ছাত্র-উস্তাদগণের জন্য এ বিভাগ থেকে তিনবেলা উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।
- গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ: বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগে বিভিন্ন যুগ জিজ্ঞাসার সমাধান ইসলামের আলোকে প্রদান করা আলেম সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই কর্তব্যবোধের তাগিদে জামিয়ায় একটি গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ চালু করা হয়েছে।